প্রেমাতাল পর্ব - ১৩ || মৌরি মরিয়ম

গেস্ট হাউজের বিল মিটিয়ে, আর্মি ক্যাম্পে এন্ট্রি করে তারপর নৌকার ঘাটে গেল ওরা। নৌকা খুঁজছিল মুগ্ধ। হঠাৎ কোত্থেকে এক ছেলে দৌড়ে মুগ্ধ দাদা ...


গেস্ট হাউজের বিল মিটিয়ে, আর্মি ক্যাম্পে এন্ট্রি করে তারপর নৌকার ঘাটে গেল ওরা। নৌকা খুঁজছিল মুগ্ধ। হঠাৎ কোত্থেকে এক ছেলে দৌড়ে মুগ্ধ দাদা মুগ্ধ দাদা করতে করতে এল। তাকে দেখেই মুগ্ধর সেকি আনন্দ। তিতির বুঝলো না এই পাহাড়ী ছেলেটার সাথে এমন কি সম্পর্ক মুগ্ধর! কাছে আসতেই তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-"মংখাই, তোমাকে পেয়ে যে কি আনন্দ হচ্ছে কি বলবো! ঢাকা থেকে আসার আগেই তোমাকে ফোন করেছিলাম। তোমার ফোন বন্ধ ছিল। ভেবেছি পাহাড়ে আছো বোধহয়। তারপর আবার থানচি এসে থেকে তোমাকে ফোন করছি। তোমার ফোন বন্ধ বলছিল। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।"
-"দাদা, ফোন বন্দু না। আমি ইক্ষন রেমাক্রি তিকা আসলাম। উখানের নেটওয়াক তো জানেন।"
-"আচ্ছা আচ্ছা ঠিকাছে, আল্লাহ মিলিয়ে দিয়েছেন।"
মংখাই নামের পাহাড়ী ছেলেটি দাঁত কেলিয়ে হাসলো। মুগ্ধ বলল,
-"শোনো, জানি তুমি মাত্র এসেছো। কিন্তু কিছু করার নাই, তোমাকে রেস্ট নেয়ার টাইম দিব না। তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।"
মংখাই হেসে বলল,
-"দাদা আমার পা যদি বাংগাও তাকে তাও আমি যাব আপনের সাতে। আপনি না নিলেও জোড় করি যাব। নৌকা ঠিক করিচেন?"
-"না। তুমি যখন এসে পড়েছো তুমিই ঠিক করো। আর ইঞ্জিন নৌকা নিও।"
-"ইঞ্জিন নৌকায় তো ম্যালা শব্দ। আপনের না বাল্লাগেনা।"
-"হ্যা। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেতে চাই। কাল যে কি বিপদে পড়েছিলাম ভাই। আর কোনো বিপদ চাইনা।"
মংখাই এতক্ষণে তিতিরকে খেয়াল করলো। বলল,
-"ভাবী?"
মুগ্ধ হেসে বলল,
-"আরে না না, আমরা এক দলে ট্রিপে এসেছি। পরে ওদের হারিয়ে ফেলেছি। দুদিন আগেও কেউ কাউকে চিনতাম না কিন্তু এখন আমরা ভাল বন্ধু হয়ে গেছি।"
তিতিরের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ভাবী কিনা জিজ্ঞেস করলো আর ও না বলে দিল! হ্যা বললে কি এবার ওর জাত যেত? মুগ্ধ তিতিরের দিকে ফিরে বলল,
-"ও হচ্ছে আমার এক ছোটভাই মংখাই। ও পাহাড়ী। কিন্তু দেখেছো কি সুন্দর বাংলা বলে?"
ছেলেটি হাসলো। হাসলো তিতিরও। মুগ্ধ বলল,
-"ও হলো এখানকার গাইড। ও সাথে থাকলে কোন চিন্তা নেই।"
মংখাই তো মুগ্ধর এমন কথায় ব্যাপক লজ্জা পাচ্ছিল। বলল,
-"দাদা, আমি নৌকা ঠিক করি?"
-"হ্যা হ্যা, আর প্লিজ একটা ছইওয়ালা নৌকা ম্যানেজ করো ভাই, আপু আছে তো।"
-"আচ্ছা আচ্ছা।"
যে সুন্দর সে সুন্দরই। নৌকার গুলুইয়ের উপর ঘোমটা মাথায় বসে থাকা কুচকুচে কালো তিতিরকে মুগ্ধর কাছে অপূর্ব রুপবতী লাগছে। তিতির তাকিয়ে নদীর চারপাশ দেখছে। ওর চোখ দুটো যেন নদীর সৌন্দর্যের তালে তালে তা তা থৈ থৈ করে নাচছে। নদীটা খুব বেশি প্রশস্ত না। তবে খুব কর্মচঞ্চল। নৌকায় নৌকায় মাঝিরা মাছ ধরছে। নদীর পাড়ে পাহাড়ী মহিলারা তাদের নিত্য কাজ করছে। কেউ কেউ কলসি কাখে হেটে যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পাহাড় থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার খেলায় মেতেছে। পুরো নদীতেই ভেলার মত লম্বা লম্বা কি যেন! দেখেই বোঝা যাচ্ছে এগুলো ইচ্ছে করে ভাসিয়ে রাখা হয়েছে। এগুলো কি মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করতে হবে, কিন্তু এখন না পরে। এখন কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করতে ইচ্ছে করছে।
মুগ্ধ নৌকার মাঝখানে শুয়ে ছিল। নৌকায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখার মজাই আলাদা। মাঝিকে বলল,
-"ও মাঝি ভাই তোমার নাম কি?"
-"জ্বী আমার নাম লোকমান।"
-"এই তুমি বাঙালী! বাড়ি কই তোমার?"
-"ময়মনসিংহ।"
-"ও, তা এইখানে যে?"
-"পেট চালানের লাইগা আব্বায় আইসিলো।"
-"ও। বিয়াসাদি কি কইরালছ?"
-"হ, কইরলাছি।"
-"ও যাই হোক, আমরা তিনজনের একজনও বিয়াসাদি করিনাই। সাবধানে নৌকা চালাইয়ো কিন্তু। তোমার যেমন বউ আছে আমাদেরও কিন্তু হবু বউ আছে। ওই যে আপুরে দেখতেসো ওনারও কিন্তু হবু জামাই আছে, তো সবারই এখন জীবনের দাম অনেক। এখন তাড়াতাড়ি চালাও যাতে তিন্দুর পর আস্তে চালাইলেও সময়ের অভাব না পরে। বুঝলা রাত্রে নৌকায় থাকা যাবে না। সন্ধ্যার মধ্যে রেমাক্রি পৌঁছাতে হবে।"
লোকমান হাসতে হাসতে বলল,
-"কুনো চিন্তা কইরেন না বাইজান। এক্কেরে টাইমের মইধ্যে লইয়া যাইবাম।"
মংখাই বলল,
-"দাদা, ও ছোটকাল তেকেই এই সাংগুতে নৌকা চালায়। চিন্তা করিয়েন না। খুব অবিজ্ঞ।"
-"ভাল কথা মনে করসো।"
তারপর মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকিয়ে ডাকলো,
-"তিতির.."
তিতির বলল,
-"হ্যা বলুন।"
-"আমরা যে নিলগিরি থেকে অনেক নিচে নদী দেখেছিলাম না? এটা কিন্তু সেই নদী, সাঙ্গু। সুন্দর না?"
-"হ্যা, সুন্দর। কিন্তু আমরা তো পাহাড়ি রাস্তায়ই এলাম। নদী তো অনেক নিচে ছিল। এত নিচে কিভাবে এলাম?"
-"কেন খেয়াল করোনি নিলগিরির পর খালি ডাউনহিল ছিল। তারপর থানচি বাজার থেকেও তো ঘাট অনেক নিচে।"
-"ও।"
হঠাৎ মনে পড়লো তিতির ভাত খেতে চেয়েছিল। উঠে বসে মংখাইকে বলল,
-"আমাদের রান্না করতে হবে বুঝলে? নৌকায় সব ব্যবস্থা আছে তো?"
-"জ্বী দাদা, সব ব্যবস্তাই আছে।"
তিতির জিজ্ঞেস করলো,
-"কি রান্না হবে?"
-"ভাত, মুরগি, ডাল, আলুভর্তা। চলবে তো?"
-"দৌড়োবে! আচ্ছা রান্নাটা আমি করি?"
-"তুমি! রান্না করতে পারো?"
-"সব পারিনা। তবে এসব পারি।"
-"কিন্তু তুমি পারবেনা তো। কেরোসিনের স্টোভে রান্না করতে হবে। করেছো কখনো? স্টোভ সামলানো অনেক ঝামেলার কিন্তু।"
-"না করিনি কখনো।"
-"তাহলে থাক, আমিই করি।"
-"আচ্ছা দুজনে মিলেই করি? আপনি চুলাটা সামলাবেন, আর আমি রান্না।"
মুগ্ধ হেসে বলল,
-"আচ্ছা আচ্ছা।"
মংখাই বলল,
-"দাদা, আমিও আছি কিন্তু।"
মুগ্ধ বলল,
-"ও হ্যা হ্যা, মংখাই কিন্তু অনেক ভাল রান্না করে।"
-"দাদা, কুনোদিন রানতে দিননাই তো। নিজেই করিচেন।"
-"তা করেছি। কিন্তু তুমি তো পারো।"
মংখাই আর কথা বাড়ালো না।
নৌকা থানচি ছাড়তেই আস্তে আস্তে জনবসতি কমে যেতে লাগলো। ২০-২৫ মিনিট যেতেই তিতিরের মনে হলো নদীটা গহীন কোনো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভয় পাওয়ারও সময় নেই। রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে।
রান্না করতে গিয়ে তিতির সত্যিই ঝামেলায় পড়লো। একটা ধার ছাড়া বটি যা দিয়ে কিছুই কাটা যাচ্ছেনা। তার উপর আস্ত মুরগি তিতির জীবনে কাটেনি। সব সময় তো মায়ের কেটে রাখা মুরগি রান্না করেছে। এখন কি হবে! তিতির মুরগিটা হাতে নিয়ে অনেক চিন্তা করলো। কোনদিক দিয়ে যে কাটা শুরু করবে তা বুঝতেই পারছেনা। এজন্যই সব কাজ শিখে রাখতে হয়। মাছ মুরগি কাটা শিখতে গেলে বাবা সবসময়ই বলে এসব শিখে তুই কি করবি? তুই কি এসব করবি নাকি? তোকে রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দেব। সে কি তোকে দিয়ে মাছ-মাংস কাটাবে? কাজের লোকেরাই তো সব করে দেবে। কিন্তু বাবা কি জানে ট্যুরে গেলে কেউ কাজের লোক নিয়ে যায়না! তাও ভাল জোর করে কয়েকটা রান্না শিখেছিল। ইশ মুরগিটা যদি কাটতে না পারে তো প্রেস্টিজের বারোটা বেজে যাবে। হঠাৎ মুগ্ধ ওর হাত পাতলো। বলল,
-"মুরগিটা আমাকে দাও। দেশী মুরগি তো, অনেক শক্ত। তুমি কাটতে পারবে না।"
তিতির দিয়ে দিল। মুগ্ধ বুঝতে পেরেছে যে ও মুরগি কাটতে পারেনা। তাই সরাসরি বলে লজ্জা না দিয়ে দেশী মুরগির দোহাই দিয়ে নিজে কাটতে নিল। মংখাই বলল,
-"দাদা, আমাকে দেন আমি কেটে দি।"
-"না না তুমি আপুর রান্নায় হেল্প করো। আমার সময় লাগবে না।"
তিতির চাল ধুয়ে ভাত বসিয়ে দিল। তাতে আলুসেদ্ধও দিয়ে দিল। মংখাই চুলাটা কন্ট্রোল করছে। মুগ্ধ মুরগিটা হাতে নেয়ার পর থেকে তিতির মুগ্ধ হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিভাবে মুরগি কাটে সেটা এখনি শিখে নেবে ও। মুগ্ধ প্রথমে মুরগিটা হাতে নিয়ে পাঁজরার হাড়দুটো আলাদা করে একহাতে গলা আরেক হাতে পাঁজর ধরে টান দিয়ে দুভাগ করে ফেলল। মাগো এই টানটা কি করে দেবে তিতির! এত জোড় আছে নাকি ওর। তারপর ভাবলো সব মেয়েরা পারলে ও অবশ্যই পারবে। তারপর রান, থান আলাদা করে টুকরো করে কেটে নিল। তারপর বুকের মাংসটা কিভাবে কাটলো সেটাও দেখে নিল। এরপর মাথাটা কেটে নিল। তিতিরের মনে হলো মাথা কাটাটা আরো বেশি ডিফিকাল্ট। তারপর দেখলো মুগ্ধ মুরগিটার নাড়িভুঁড়ির মধ্যে থেকে গিলা, কলিজা বের করে আনলো। গিলাটা লম্বালম্বি একটু কেটে আংগুল দিয়ে টেনে টেনে ভেতরের ময়লাটা বের করে ফেলে দিল। এএএহ! এভাবে গিলা পরিস্কার করে। আর ভেতরে এত বিচ্ছিরি ময়লা থাকে! ইয়াখ.. ও আর জীবনে গিলা খাবেনা। সবশেষে মুরগির পা দুটো চুলায় পুড়িয়ে পুড়িয়ে চামড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছিঁড়ছিল মুগ্ধ। পায়েও এত কাহিনী করা লাগে! তিতির জিজ্ঞেস করলো,
-"পা কে খাবে?"
-"কেন খাওনা?"
-"না।"
-"আমি খাই, মংখাই খাও?"
-"জ্বী দাদা, খাই।"
-"হয়ে গেল! তুমি আর পাচ্ছো না।"
একথা বলেই মুগ্ধ হাসলো। তিতিরও হাসলো। তারপর মুরগিটা ধুয়ে এগিয়ে দিল। বলল,
-"নাও এবার রান্না করো।"
-"আপনি এত সুন্দর মুরগি কাটা শিখলেন কোত্থেকে?"
-"কেন মায়ের কাছ থেকে!"
-"ওহ।"
-"মা কি বলতো জানো?"
-"কি?"
-"বলতো, 'মুগ্ধ মুরগি কাটা শেখ, মাছ কাটা শেখ, রান্না শেখ। তোর জন্য তো রাজকুমারী নিয়ে আসবো। সে যদি না পারে তোকে তো পারতে হবে। তাড়াতাড়ি শিখে নে।' আর জানো আমিও দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে আগ্রহ নিয়ে শিখতাম। যাতে বউকে এসব করে দিতে পারি.. হা হা হা।"
তিতির ওর বাবার কথাগুলো আর মুগ্ধর মায়ের কথাগুলো মিলিয়ে নিল। এটা কি শুধুই কো-ইন্সিডেন্স নাকি কোনো ইশারা! খুশি যেন উপচে পড়ছিল তিতিতের। তিতির খুব যত্ন করে ভাত, আলুভর্তা, ডাল করে ফেললো। মুগ্ধও হেল্প করলো। কিন্তু প্রব্লেম হলো মুরগি রান্নার সময়। কিছুতেই তিতির মশলা বাটতে পারছিলনা। জীবনে প্রথম পাটায় হাত দিয়েছে। বাটছে ঠিকই কিন্তু কোনো কিছু আর এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছেনা। মুগ্ধ তাকিয়ে ছিল তাই তিতির খুব লজ্জা পেয়ে গেল। মুগ্ধ নিশ্চই এখন এটাও এর হাত থেকে নিয়ে নিজেই বেটে দেবে! হায় খোদা! কেন ও এসব পারেনা। মুগ্ধ বলল,
-"কখনো পাটায় হাতও দাওনি বোধহয়?"
-"না।"
-"বুঝেছি। আচ্ছা রেখে দাও। আমি ব্যবস্থা করছি।"
তিতির মন খারাপ করে বলল,
-"আপনি বাটবেন এখন?"
মুগ্ধ বলল,
-"আরেনা। মা আবার এটা শেখায়নি। বলেছে বউকে ব্লেন্ডার কিনে দিতে। হা হা হা।"
তিতিরও হেসে দিল। মুগ্ধ আদা রসুন গুলো নিয়ে বটি দিয়ে কুচি কুচি করে কাটলো। তিতির বলল,
-"এগুলো কি করবেন?"
-"এভাবেই দেব মুরগিতে।"
-"আস্ত আস্ত?"
-"আস্ত কই? দেখোনা কুচি কুচি।"
-"কেমন যে লাগবে!"
-"আমি নিজের মত রান্না করি। খাওয়ার সময়েই দেখো কেমন লাগে!"
মুগ্ধ নিজ হাতে রান্না করলো মুরগিটা।
সত্যি মুরগিটা কতটা যে মজা হয়েছিল তা খাওয়ার সময় টের পেল সবাই। নৌকা একটা তীরে ভিড়িয়ে ওরা খেয়ে নিয়েছিল। খাওয়া শেষে মুগ্ধ বলল,
-"তিতির, তুমি এখন ছইয়ের মধ্যে চলে যাও, রেস্ট নাও। আমি না বললে বের হয়ো না।"
-"আচ্ছা।"
একথা বলেই ভেতরে ঢুকে গেল তিতির। মুগ্ধ ছইয়ের পর্দা টেনে দিল। তারপর ছইয়ে হেলান দিয় বাইরে বসে রইলো। হঠাৎ ভেতরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল তিতির ঘোমটা ফেলে ছোট একটা আয়না হাতে নিয়ে নিজের মুখ ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে দেখছে। মুগ্ধ আস্তে করে পর্দাটা সড়িয়ে গান ধরলো,
"কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি..
কালো তারে বলে গায়ের লোক।
মেঘলা দিনে.. দেখেছিলেম মাঠে,
কালো মেয়ের কালো হরিন চোখ!
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে..
মুক্ত বেনী পিঠের ওপর লটে।
কালো!!!
তা সে যত কালোই হোক
দেখেছি তার কালো হরিন চোখ!
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি।"
এটুকু গেয়েই মুগ্ধ আবার পর্দা টেনে দিল। তিতিরের এই প্রথম আফসোস হলো, "ইশ কালো কেন হলাম না।"
থানচির পর তিন্দুতে এসে কিছু জনবসতি দেখা গেল। কিন্তু সেটা খুবই কম। ১৫/২০ ঘরের বেশি হবেনা। এখানটায় প্রচুর স্রোত। ওদেরকে নেমে নদীর তীর ধরে হাটতে হলো। আর লোকমান, মংখাই মিলে নৌকায় দড়ি বেধে টেনে টেনে স্রোতের অংশটা পার করলো। তারপর ওরা আবার নৌকায় উঠলো। কিছুদূর পর আবার সেই স্রোত। আবার নামলো, আবার হাটলো। এভাবে অনেকবারই নামতে হলো। হাটতে হাটতে অনেক গল্পই হয়েছিল। তার মধ্যেই একবার তিতির বলল,
-"সাফি ভাইয়াদের হারিয়ে ফেলে ভালই হয়েছে বলুন। নাহলে এত এত এডভেঞ্চারের কিছুই হতো না। যদিও কাল ভয় পেয়েছিলাম বিপদে পড়ে কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যারা দলেই আছে তারা তো এরকম পরিস্তিতিতে পড়েনি, তারা খুব মিস করলো।"
মুগ্ধ হাসলো। তিতির বলল,
-"হাসছেন যে?"
-"আমরা কিন্তু এখনো বিপদ থেকে বের হতে পারিনি।"
-"নাহলে না পেরেছি, আমার আর ভয় করছে না। আপনি আছেন তো!"
কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা চলে এল বড়পাথর। এলাকার নামই বড়পাথর। এখানে কোন জনবসতি নেই। আছে শুধু বড় বড় পাথর। তাও আবার পানির মধ্যে। একতলা দোতলা বাড়ির সমান উঁচু বিশাল বিশাল পাথর। যার কিছু অংশ পানির নিচে, কিছু অংশ পানির উপরে। ছোট, বড়, মাঝারি বিভিন্ন সাইজের পাথর। তার মধ্য দিয়েই নৌকা চালাচ্ছে লোকমান। সোজা তো আর চালানো যায়না। এঁকেবেঁকে প্রকান্ড পাথর গুলোকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। পানির নিচে আবার আছে ডুবোপাথর। নৌকা যদি কোনক্রমে একটা ডুবোপাথরের সাথে ধাক্কা লাগে তাহলে পুরো নৌকাই উল্টেপাল্টে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তিতিরের বোধহয় এসব দেখে ভয় করছিল। কিন্তু কিছু বলছিল না। ছইয়ের ভেতর থেকেই এসব দেখছিল। মুগ্ধ ওর ভয় কাটানোর জন্য ওর সাথে টুকটাক গল্প করছিল।
-"জানো তিতির, এখানকার স্থানীয় মানুষেরা মানে পাহাড়ীরা এই বড়পাথরের সবচেয়ে বড় পাথরটাকে পুজো করে।"
-"কেন?"
-"সবচেয়ে বড় পাথরটাকে ওরা রাজা বলে মানে। ওদের বিশ্বাস বহুকাল আগে তিন্দু রাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তার পুরো পরিবার ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে সাঙ্গু নদীর এই যায়গায় ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তারপর তারা সবাই পাথর হয়ে যায়। তাই স্থানীয়রা এটাকে ধর্মীয় স্থান বলে মানে, পুজো দেয়।"
রেমাক্রির দিকে যেতেই মুগ্ধ ছইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল,
-"লোকমান ভাই আমাদের একটু রেমাক্রি ফলসের দিকে নিয়ে চলো। তুমি অনেক তাড়াতাড়ি আর সেফলি এনেছো, আলহামদুলিল্লাহ। এখনো হাতে সময় আছে। এত সুন্দর একটা যায়গা তোমার এই আপুর মিস করা কি ঠিক হবে? দুদিন পর বিয়ে হয়ে যাবে তো, ওর হাসবেন্ড কেমন না কেমন হয় বলা তো যায়না বলো? সে যদি যদি ওকে নিয়ে এখানে না আসে?"
লোকমান হেসে বলল,
-"আচ্ছা ভাই।"
তিতির মনে মনে বলল, 'আপনিই আমার হাসবেন্ড হয়ে যাননা।' কিন্তু মুখে বলল,
-"রেমাক্রি ফলস আবার কোনটা?"
মুগ্ধ বলল,
-"এই যে সাংগু নদী, এটা রেমাক্রি খালের সাথে মিশে শেষ হয়ে গেছে। রেমাক্রি ফলস হলো রেমাক্রি খালের উৎপত্তিস্থল। ছোট ছোট পাহাড়ের কারনে ওখানে একটা ন্যাচারাল জলপ্রপাত তৈরী হয়েছে। অসম্ভব সুন্দর একটা জলপ্রপাত। রেমাক্রি যাওয়ার পথে পড়েনা। একটু ঘুরে যেতে হয় তাই অনেকেই ওখানে যায়না। ইভেন অনেকে জানেও না।"
-"ও।"
রেমাক্রি ফলসের দিকে যেতে যেতে দূর থেকেই যখন তিতির জলপ্রপাতটা দেখতে পেল তখন ও নিজের দুই গালে দুই হাত দিয়ে চোখগুলো বড় বড় করে অজান্তেই বলল,
-"ওয়াও। এটা কি? আমি কি সত্যি দেখছি, নাকি স্বপ্ন।"
মুগ্ধ মিটিমিটি হাসছিল আর মনে মনে বলছিল, 'আমি জানি তুমি তোমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর যায়গাগুলোর একটাতে যেতে চলেছো। তুমি খুশি হয়েছো। জানি তুমি আরো অনেক অনেক বেশি খুশি হবে যখন তুমি জলপ্রপাতের বাঁধনহারা পানিতে পা রাখবে। তুমি যেমন জলপ্রপাতটায় যাওয়ার অপেক্ষায় আছো, আমিও তেমন তোমার ওই সময়ের খুশিটা দেখার অপেক্ষায় আছি। হ্যা, আজ আমি আর জলপ্রপাতটা দেখবো না, তোমার খুশি দেখবো.. তোমাকে দেখবো। তুমি প্রকৃতির চেয়ে কোনো অংশে কম নও।'
নৌকা রেমাক্রি ফলসের যত কাছে যাচ্ছে পানির শব্দ বাড়ছে। তিতির বিস্ময়ে কি করবে বুঝতে পারছিলনা। সেটা বোঝা গেল যখন ও নৌকায় বসা থেকে উঠে এসে দুহাতে মুগ্ধর বাহু জড়িয়ে ধরে নৌকার মধ্যেই লাফাতে শুরু করে দিল। আর বলল,
-"উফ, বলেন না কখন যাব? আমি কিন্তু নামবো।"
মুগ্ধও এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছিল তিতিরের আনন্দ আর উচ্ছলতা দেখে। এ যেন অন্য তিতির। বলল,
-"হুম নামবে।"
তিতির বলল,
-"লোকমান ভাই তাড়াতাড়ি চালান না।"
যখন ওরা রেমাক্রি ফলসে পৌঁছলো তখন পড়ন্ত বিকেলের আলো যেন জলপ্রপাতে একটা মায়াবী সৌন্দর্য যোগ করেছিল। হয়তো প্রকৃতির এই আয়োজন প্রথমবার তিতিরকে মুগ্ধ করার জন্যই। প্রথমে মুগ্ধ নামলো রেমাক্রি ফলসের পানিতে। তারপর তিতিরের হাত ধরে ওকে নামালো। তিতির স্যান্ডেল খুলে নামছিল। মুগ্ধ বলল,
-"ওটা পড়ে থাকো। পাথর অনেল পিচ্ছিল আর অনেক ধার!"
তিতির তাই করলো। বিশাল জলপ্রপাত তবে প্রশস্তে, উচ্চতায় খুবই সামান্য। প্রায় ৮/৯ টি ধাপ একেবারে সিড়ির মত। কিন্তু একেকটা ধাপে অনেক যায়গা। একেকটা ধাপ যে কতটা ধারালো তা এর উপর থেকে পড়া পানির আকার দেখলেই বোঝা যায়। শেষ ধাপের পরই রেমাক্রি খাল। তিতিরকে হাত ধরে ধরে প্রত্যেকটা ধাপে নিয়ে গেল মুগ্ধ। তিতির পথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির উপর দিয়ে হাটছিল আর খিলখিল করে হাসছিল। একেবারে উপরের ধাপে সবচেয়ে বেশি যায়গা। তিতিরকে নিয়ে মুগ্ধ সেখানে চলে গেল। সেখানে পানি ছিল অন্য সব ধাপের চেয়ে বেশি। এত পানি পায়ের নিচে পেয়ে তিতির লাফাতে শুরু করে দিল। মুগ্ধ বলল,
-"এত লাফিও না। পা কেটে যাবে।"
জলপ্রপাতের পানি পড়ার শব্দে শুনতে পেল না তিতির। যদিও হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে তবু চিৎকার করে বলল তিতির,
-"কি বলছেন? শুনতে পাচ্ছিনা.. জোড়ে বলুন, চিৎকার করে বলুন। আমার মত করে।"
তারপর আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। মুগ্ধ হেসে তিতিরের মতই চিৎকার করে কথাটা আবার বলল। তিতির আবার চিৎকার করে উত্তর দিল,
-"যাক, পা কেটে যাক, সময় কেটে যাক। সারা জীবন কেটে যাক। আমি এখানেই থাকবো আর লাফাবো।"
তারপর আবার খিলখিলিয়ে হাসলো। আবার লাফাতে লাগলো। মুগ্ধ কিছু বলল না। শুধু শক্ত করে তিতিরের হাত ধরে রাখলো। পানির যেই স্রোত। ও ধরে না থাকলে এতক্ষনে তিতির রেমাক্রি খালে থাকতো। লাফাতে লাফাতে তিতির হঠাৎ পড়ে গেল। পড়ে যেয়ে ওর হাসি আরো বেড়ে গেল। মুগ্ধ তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরে ওঠানোর চেষ্টা করলো। ও নিজে তো ওঠার চেষ্টা করলোই না বরং মুগ্ধর হাত ধরে টান দিয়ে ওকেও ফেলে দিল। মুগ্ধ পড়ে যেতেই তিতির আরো জোড়ে জোড়ে হাসতে লাগলো। আচমকা পড়ে যাওয়ায় মুগ্ধ ব্যালেন্স না রাখতে পেরে পানির স্রোতের সাথে ভেসে যাচ্ছিল। আর তিতিরের তো কোন ব্যালেন্স ছিলই না। দুজনেই ভেসে ভেসে যাচ্ছে। তিতির খিলখিল করে হাসছে। কিন্তু মুগ্ধ ভয় পাচ্ছিল। কি হবে এখান থেকে প্রথম ধাপে পড়লেই তো একে একে প্রত্যেকটা ধাপে পড়বে। তারপর সোজা উপড়ে! কি করবে! পা হাতড়ে খুজছিল, যদি কিছু একটা পাওয়া যায়। এখানে তো কত উঁচু নিচু পাথর আছে। যদি একটা উঁচু পাথরে পা টা আটকে যেত! তাহলে দুটো জীবন বেঁচে যেত!
একটা পাথর না হলেও একটা ছোট গর্তে পা আটকাতে পারলো মুগ্ধ। তিতির তখনও খিলখিলিয়ে চলেছে। মুগ্ধ একটা হাতে ধরে রাখতে পারছিলনা ওকে। তাই দুই হাত দিয়ে ধরে নিজের কাছে না এনে নিজেই কাছে চলে গেল। ওকে কাছে আনতে গেলে হয়তো পাথরের ঘষায় ও আঘাত পেতে পারে। পানির স্রোতে তিতির মুগ্ধর বুকের মাঝে এসে ধাক্কা খেল। তাতেও হাসি। খুশিতে মেয়েটার মাথার তার একটা ছিড়ে গেছে বোধহয়।
ওদের এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করলো মংখাই আর লোকমান।
যখন ওরা রেমাক্রি পৌঁছল, সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। লাল আলোর আভায় ভরে গেছে চারপাশ। যায়গাটা বেশ পছন্দ হলো তিতিরের। থানচি ছিল সাধারন মফস্বলের বাজার এলাকার মত, তিতিরের একটুও পছন্দ হয়নি। কিন্তু এখানে নৌকার ঘাট থেকেই রেমাক্রি গ্রাম শুরু। ৩০/৪০ পাহাড়ী পরিবারের বসতি হবে। পুরো গ্রামটাই পাহড়ের উপর। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। গ্রামের একপ্রান্তে দেখা গেল একটা কাঠের ব্রিজ। ব্রিজ পার করে ওপাশে ছোট্ট একটা পাহাড়। মুগ্ধ বলল,
-"ব্রিজের ওপাশে পাহাড়টার উপর যে বড় ঘর দেখতে পাচ্ছো সেটাই রেমাক্রির একমাত্র গেস্ট হাউজ। পুরোটাই কাঠের তৈরী, ইভেন ফ্লোরও কাঠের।"
-"ও। আচ্ছা, একটা ঘর এত বড় কেন?"
-"আরে না না বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে একটা ঘর। কিন্তু ওর ভেতরে কয়েকটা ঘর আছে।"
কাঠের ব্রিজটা পার হয়ে গেস্ট হাউজে গিয়েই মুগ্ধর আক্কেলগুড়ুম! রেমাক্রি গেস্ট হাউজ পুরোটাই খালি। ২৬ জনের কোন দলই আজ আসেনি। সাফিরা আজ ভোরে রওনা দিল অথচ এখনো পৌঁছতে পারেনি! কি হলো! এখন তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর ডুবো পাথরের জন্য নদীতে নৌকা চলা একেবারেই নিষিদ্ধ।
To be continued...

COMMENTS

Name

অচেনা প্রান্তর,1,অনুভুতির প্রতিশোধ,3,অপেক্ষা,1,অবিদিত সেই তুমি,1,অ্যাফ্লিক্টেড বোবা,1,আপেক্ষিক,1,আমার জন্ম ভূমি,1,আরেক জগৎ,1,আসবে মরণ,1,আহারে জীবন,1,ঈদের চাঁদ,1,উপন্যাস,31,একে আজাদ,4,ওরে খোকা,1,কবিতা,19,কলমের শক্তি,1,গল্প,34,চাঁদ মামা,1,চিত্তের আর্তনাদ,1,ছোট গল্প,9,জিসান আহম্মেদ রাজ,24,দৃষ্টির আগোচরে,3,ধৈর্যের ফল,1,ধোকা,12,পিচ্চি বউ,13,প্রত্যাবর্তন,2,প্রেমাতাল,31,ফরিদ সরকার,10,ফারজানা শারমিন,2,ভিন্ন চোখ,1,ভুল,1,মিছে স্বপ্নের জাল বুনি,1,মেঘ রোদ্দুর,2,মৌরি মরিয়ম,31,শফিক নোমানী,3,শশুরবাড়ি,6,সুখ দুঃখ,1,সুরভিত অতীত,1,সেই তুমি,1,সৌরভ সাধুখান,1,হৃদয় চৌধুরী,18,
ltr
item
LekhaPriyo.Com - Writers & Readers Network: প্রেমাতাল পর্ব - ১৩ || মৌরি মরিয়ম
প্রেমাতাল পর্ব - ১৩ || মৌরি মরিয়ম
https://3.bp.blogspot.com/-kXPikmMR8GQ/XLLhybdXSdI/AAAAAAAAARA/WoSCuMGlsl8DtgA0u6CAHfd2JcN1JMb-gCPcBGAYYCw/s320/Logopit_1555224034127.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-kXPikmMR8GQ/XLLhybdXSdI/AAAAAAAAARA/WoSCuMGlsl8DtgA0u6CAHfd2JcN1JMb-gCPcBGAYYCw/s72-c/Logopit_1555224034127.jpg
LekhaPriyo.Com - Writers & Readers Network
https://www.lekhapriyo.com/2019/05/blog-post_5.html
https://www.lekhapriyo.com/
https://www.lekhapriyo.com/
https://www.lekhapriyo.com/2019/05/blog-post_5.html
true
1831162134532447050
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content