প্রেমাতাল পর্ব - ১৮ || মৌরি মরিয়ম

জলপ্রপাতের পানিতে ভাসতে ভাসতে আর স্রোতের ধাক্কা খেতে খেতে তিতিরের সারা শরীর যেন অসাড় হয়ে পড়ছিল। তিতির পানি থেকে ওঠার কথা মুগ্ধকে বলতে গি...


জলপ্রপাতের পানিতে ভাসতে ভাসতে আর স্রোতের ধাক্কা খেতে খেতে তিতিরের সারা শরীর যেন অসাড় হয়ে পড়ছিল। তিতির পানি থেকে ওঠার কথা মুগ্ধকে বলতে গিয়ে দেখলো কোনো কথাই বলতে পারছেনা। কথা বলার জন্য যে মিনিমাম শক্তিটুকু দরকার তা ওর ওই মুহূর্তে ছিলনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুগ্ধ বলল,
-"এইযে তিতিরপাখি, চলো এবার ওঠা যাক। এর বেশি থাকলে পরে তোমার কষ্ট হবে।"
তিতির কিছু বলতে পারলো না। মুগ্ধ ওর উত্তরের অপেক্ষা না করেই উপরে উঠলো। সাথে সাথে দোলা এসে ওদের বেল্ট আর দড়ি খুলে দিল। তিতির নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়েছে। মুগ্ধর ব্যাগে আরো দুই বোতল পানি ছিল। একটা বের করে তিতিরকে খাওয়ালো। তিতির অর্ধেকটা পানি খেয়ে আবার শুয়ে পড়লো। মুগ্ধ বাকি পানিটুকু খেয়ে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিল। হঠাৎ তিতিরের দিকে তাকাতেই দেখলো তিতির উঠে বসেছে। জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর হাসছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তাকিয়ে আছে জলপ্রপাতের সেই স্রোতধারা গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ পর তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আপনি জানেন না আপনি আমাকে আজ কি দিয়েছেন! এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। যতক্ষণ আমি ওখানে ছিলাম আমার মনে হচ্ছিল আমি অন্য কোনো এক জগতে আছি। যদিও আমার একফোঁটা শক্তি ছিলনা কিন্তু আমার খুব ভাল লাগছিল। খুব খুব খুব!"
মুগ্ধ হাসলো শুধু কিছু বললনা। দোলা বলল,
-"এত ভাল লাগছে তাহলে কাঁদছ কেন?" তিতির হাসতে হাসতে বলল,
-"আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না আপু। আমার এই কান্নাটা অবশ্যই খুশির কান্না! আমার জীবনে এত সুখের মুহূর্ত আগে কখনো আসেনি। কিন্তু কেন জানিনা কান্নাটা আমি থামাতে পারছিনা।"
মুগ্ধ বলল,
-"আমি তো দেখছি তুমি হাসিটাও থামাতে পারছ না!"
তিতির আবার হাসলো। মুগ্ধ ব্যাগ থেকে টাওয়াল বের করে দিল। বলল,
-"নাও মাথাটা ভাল করে মুছে নাও।"
তিতির টাওয়াল নিল। মুগ্ধ ব্যাগ নিয়ে উঠে কোথায় চলে গেল। একটু পর ভেজা থ্রি-কোয়ার্টার পালটে শুকনো একটা পড়ে ফিরে এল। তিতির এখনো সেই যায়গায় একা একা বসে আছে। আর গ্রুপেরই একটা ছেলে ওর দিকে তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে। নজরটা যে কোনদিকে তা বুঝতে মুগ্ধর অসুবিধা হলো না। ট্রিপে এসে ছেলেটাকে কিছু বলাও তো যাবে না। তিতিরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,
-"তিতির ব্যাগ তো আনোনি না?"
-"না।"
-"এক্সট্রা কাপড় যখন আনোনি ভেজাটা উচিৎ হয়নি।"
তিতির বলল,
-"প্রব্লেম নেই।"
-"প্রব্লেম আছে। দোলা ছোট একটা ব্যাগ এনেছে, ওকে জিজ্ঞেস করো তো ওর কাছে এক্সট্রা কাপড় আছে কিনা।"
তিতির উঠে গিয়ে দোলার সাথে কথা বলে ফিরে এল। বলল,
-"আপু ব্যাগে কাপড়চোপড় আনেনি। শুকনো খাবার এনেছে।"
-"ও।"
তারপর মুগ্ধ নিজের ব্যাগ থেকে একটা টি-শার্ট বের করে তিতিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"নাও এটা পড়ো।"
তিতির অবাক চোখে,
-"এটা আপনার?"
-"হ্যা।"
এবার তিতির হো হো করে হেসে উঠলো,
-"ওর মধ্যে দুটো আমি ঢুকতে পারবো।"
-"সেটা আমি জানি। লাগলে তিনটা তুমি ঢোকো গিয়ে। যাও, আর একটা কথাও না বলে চেঞ্জ করে এসো। ওই ঝোপের আড়ালে গিয়ে চেঞ্জ করো।"
-"থ্যাংকস বাট সত্যি কোনো দরকার নেই। আমার ঠাণ্ডা লাগবে বলে বলছেন তো? আমার এটুকুতেই ঠান্ডা লাগেনা, কোনো প্রব্লেম হবেনা। এটা আপনিই পড়ুন।"
-"তিতির বাম পাশের চেক শার্ট পড়া ছেলেটা তোমার ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি দেখেছি, দেখে খুব রাগ লেগেছে। মন চাইছিল চোখদুটো গেলে দিই। ট্রিপে কোনো ঝামেলা করতে চাচ্ছিনা। তাই বলছি চেঞ্জ করো।"
তিতিরের চোখগুলো রসগোল্লা হয়ে গেল। নিজের কানকে বিঃশ্বাস করতে পারছিল না। মুগ্ধ বলল,
-"একদম ডিরেক্টলি না বললে কিছুই বোঝোনা কেন? আজব!"
তিতির আর একটা কথাও না বলে টি-শার্ট টা নিয়ে ঝোপের মধ্যে চলে গেল। তারপর টি-শার্ট টা বুকে জড়িয়ে ধরলো, স্মেল নিল। ইশ, মুগ্ধ কত খেয়াল রাখে ওর যতটা ও নিজেও রাখতে পারেনা। উড়তে ইচ্ছে করছে, উড়তে! মুগ্ধর স্মেলটাও এত মারাত্মক কেন?
মুগ্ধর টি-শার্ট টা তিতিরের হাটু সমান লম্বা হয়েছে, আর এত ঢোলা যে আরো দুএকজন ঢুকতে পারবে। তাতে কিছু যায় আসেনা। মুগ্ধর টি-শার্ট পড়া মানে অনেক কিছু যা কেউ বুঝবে না। আরেকবার টি-শার্ট টা নাকের কাছে এনে স্মেল নিয়ে বেড়িয়ে এল ঝোপের বাইরে। ওকে দেখে দোলা হেসে দিল। আরো অনেকেই হাসলো বোধহয় কিন্তু ও একটুও অস্বস্তিবোধ করছিল না। খুব পার্ট নিয়ে ছিল।
এবার ফেরার পালা। প্রায় ৪-৫ ঘন্টা নাফাখুমে কাটিয়ে ওরা ফেরার পথে হাটা ধরলো। পথে তিতিরকে ৯ বার জোকে ধরলো, মুগ্ধ একইভাবে জোক ছাড়িয়ে দিল। সবারই কেমন যেন কথাবার্তা ফুরিয়ে গেছিল, জলপ্রপাতের ঘোর কারোরই কাটেনি। সেই কোমড় সমান পানির যায়গায় এসে মুগ্ধ বিনাবাক্যে তিতিরকে কোলে নিয়ে হাটা শুরু করলো। কোলে নিতেই তিতির ওর গলা জড়িয়ে ধরলো। একটা অদৃশ্য অধিকারবোধ দুজনের মধ্যেই কাজ করছিল। মুগ্ধর টি-শার্ট তিতিরকে দেয়ার কারনে মুগ্ধ ছিল খালি গায়ে। এটাও একটা দেখার মত দৃশ্য ছিল। তিতিরের কেমন যেন লাগছিল! মুগ্ধ ছিল খালি গায়ে আর লজ্জা লাগছিল ওর। হাতগুলো মুগ্ধর খালি গায়ে লাগছিল। আর যখনি সে হাতের কুনুই ওর বুকের লোমগুলোর সাথে লাগছিল তখন সুড়সুড়ি লাগছিল তিতিরের। যেদিন এসেছিল সেদিন মুগ্ধর মুখে খুব ছোট ছোট দাঁড়ি ছিল। এখন সেগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। তিতির সেদিকে তাকিয়ে ছিল। মুগ্ধকে এখন আরো বড় বড় লাগছে। তিতির মুগ্ধর গলার পিছনে দুহাত বেধে রেখেছিল। হঠাৎ একটা হাত দিয়ে মুগ্ধর গলা জড়িয়ে আরেকটা হাত নামিয়ে মুগ্ধর দাড়িতে রাখলো। মুগ্ধ চমকে তাকালো তিতিরের দিকে। তিতির লজ্জা পেয়ে ওর দাড়ি ছেড়ে দিয়ে আবার গলার পিছনে হাত বাধলো।
রেমাক্রি ফিরতে ফিরতে বিকাল ৫ টা বাজল। সবাই ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে নিল। তারপর যে যার মত রেস্ট নিচ্ছিল। তিতির বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়েছিল। খুব ক্লান্ত লাগছিল। পা গুলো যেন ভেঙে আসছিল। জানালা গুলো নিচু হওয়ার কারনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নদী, পাহাড় সবই দেখতে পাচ্ছিল তিতির। হঠাৎ বারান্দায় মুগ্ধকে দেখা গেল। মুগ্ধ ওকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করল,
-"কি ব্যাপার? ঘুমকুমারী না ঘুনিয়ে তাকিয়ে আছে যে!"
-"আমার এত ক্লান্ত লাগছে যে ঘুমাতেও পারছিনা।"
-"আরে ঘুরতে আসলে ওরকম একটুআধটু হয়। রাতে একবারে ঘুমিও। এখন চলো তো।"
-"কোথায়?"
-"রেমাক্রি বাজারে যাব। চলো মজা হবে।"
-"কি মজা?"
-"বাজারে কতরকম ফল, সবজি ওঠে। সব তুমি চিনবেও না।"
-"না প্লিজ আমি যাব না, আপনি যান। আমি এখন আরো হাটলে মরেই যাব।"
-"এহ! তুমি হাটলা কখন? কোলে কোলেই তো গেলে আসলে। আর জলপ্রপাতের পানিতে? সেখানেও তো কোলেই ছিলে।"
তিতির অবাক হয়ে বলল,
-"মানুষের উপকার করে আবার খোঁটা দিচ্ছেন? কি খারাপ আপনি।"
-"সেটাতো অবশ্যই।"
-"আপনি যান। আমি যাবনা।"
-"কোলে করে নিলে যাবে?"
তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে হেসে দিল। মুগ্ধও হেসে দিল। তারপর বলল,
-"আচ্ছা তুমি রেস্ট নাও। আমি যাই।"
তিতির কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল তা ওর মনে নেই। ঘুম ভাঙলো দোলার ডাকে। উঠতেই দোলা বলল,
-"আহা ঘুমিয়ে ছিলে, ওদিকে তোমার আশিক তো তোমাকে ছাড়া মরেই যাচ্ছিল। মনের দুঃখে শেষে রান্নাই করতে চলে গেল।"
তিতির লজ্জা পেয়ে হাসলো। দোলা বলল,
-"আরে এত লজ্জার কি আছে? আমিই তো।"
-"নাহ আসলে তেমন কিছু না।"
-"ইশ আর লজ্জা পেয়ে মিথ্যে বলতে হবেনা। আমরা এতক্ষণ তোমাদের এডভেঞ্চারের গল্প শুনছিলাম।"
-"কোন গল্প?"
-"ডাকাতের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচার গল্প।"
-"ওহ।"
-"তাইতো বলি দুজনের মধ্যে এত ভাব হলো কখন?"
তিতির কি বলবে লজ্জায় তো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। দোলা বলল,
-"তুমি খুব লাকি বুঝলে? তোমার আগে কোনো মেয়েকে ভাইয়া এতটা প্রায়োরিটি দেয়নি। ওদের একটা কাজিন আছে 'ইকরা'। ভাইয়াকে পাগলের মত লাভ করে আর ভাইয়া পাত্তাই দেয়না।"
হঠাৎ তিতিরের মনে পড়লো সেইযে মেসেজ দেয় 'পেরা' সেই ইকরা নয়তো? কিন্তু সে তো ভার্সিটির, কাজিন তো না। নাকি কাজিনই বাট একই ভার্সিটিতে পড়ে। দোলা বলল,
-"এই বলোনা, কিভাবে প্রোপোজ করল?"
তিতির বলল,
-"প্রোপোজ! তুমি ভুল ভাবছো.. সত্যি প্রোপোজ করেনি। আমাদের মধ্যে তেমন কিছুই হয়নি।"
দোলা অবাক হয়ে বলল,
-"ভাইয়াও তাই বলল। কিন্তু বিশ্বাস করিনি। আই মিন তোমাদের মধ্যে রিলেশনশিপ চলছে সে ব্যাপারে আমি সিওর ছিলাম তা নাহলে কোলে নেয়া। একই দড়িতে পানিতে নামা। দুজনের কথাবার্তা, দুজনের দুজনের দিকে তাকানো! এসব কিভাবে সম্ভব!"
তিতির এবার বলল,
-"আসলে আমি ওনাকে পছন্দ করি। উনিও হয়তো করে কিন্তু কিছু বলেনি তো কখোনো। তাই সিওর না।"
-"ওয়াও, দ্যাটস গ্রেট। তুমি তাহলে ওকে বলে দাও তোমার ফিলিংসের কথা।"
-"না না আমি বলতে পারবো না।"
-"কেন?"
-"উনি যদি পছন্দ না করে আর রিজেক্ট করে তাহলে মানতে পারবো না। তার চেয়ে অপেক্ষা করি।"
-"সেকী! রিজেক্ট কেন করবে?"
-"হতেও তো পারে ওনার আমাকে পছন্দ না। আফটারঅল মাত্র ৩/৪ দিন ধরে চিনি আমরা একে অপরকে।"
-"আরে আমরা তো চিনি ভাইয়াকে। ও ভাল না বাসলে এরকম করতোই না।"
-"তবু আমি অপেক্ষা করবো আপু।"
-"কতদিন অপেক্ষা করবে? এর মধ্যে যদি অন্য কেউ ঢুকে পড়ে? আর ভাইয়া তার হয়ে যায়?"
-"উনি আমার হলে কখনোই অন্য কেউ ঢুকে পড়তে পারবে না। আর ঢুকলেও উনি তার হবে না। হলে বুঝতে হবে আমি ভুল ভেবেছি। উনি আসলে আমাকে ফিল করেনি।"
-"হায় আল্লাহ! কোন দুনিয়ায় আছি।"
তিতির দোলার হাত ধরে বলল,
-"প্লিজ আপু আমাকে ছুঁয়ে বলো যে তুমি ওনাকে আমার ফিলিংসের কথা কিছু বলবে না। আমি চাই উনি নিজ থেকে আমাকে বুঝুক আর প্রোপোজ করুক।"
দোলা তিতিরের হাত ধরে হেসে বলল,
-"আচ্ছা বলবোনা। দোয়া করি খুব তাড়াতাড়ি আমার বড় জা হয়ে যাও।"
তিতির লজ্জা পেয়ে গেল। দোলা হাসতে হাসতে বাইরে বেড়িয়ে গেল।
রাতে সবাই খেতে বসেছে। তিতির বারান্দায় দড়িয়ে ভাবছিল মুগ্ধরই কথা। এমন সময় পিছন থেকে মুগ্ধ বলল,
-"এইযে সুন্দরী, আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে যাচ্ছি।"
-"মোটেই খোঁজেননি। আমি এখানেই ছিলাম।"
মুগ্ধ হেসে বলল,
-"আচ্ছা আচ্ছা, তোমার ক্লান্তি গেছে?"
তিতির হেসে বলল,
-"হুম, ঘুমিয়েছি না?"
-"পা ব্যাথা?"
-"পা ব্যাথা আছে। এত হাঁটিনিতো কখনো।"
-"ওহ। হুম ডিনার করে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিও। ব্যাথা কমে যাবে।"
-"আচ্ছা।"
-"তোমার জন্য বাঁশ রেঁধেছি। চলো খাবে।"
-"কি?"
মুগ্ধ হেসে বলল,
-"বান্দরবানে বলেছিলাম না বাঁশ কুরুইল খাওয়াবো সুযোগ পেলে? ওটাই রান্না করেছি। ওটা আনতেই বাজারে গিয়েছিলাম।"
বাঁশ কুরুইল টা সত্যি অসাধারণ ছিল। নরম নরম আর খুব টেস্টি। চিকেন দিয়ে ঝাল ঝাল করে রান্না করেছে মুগ্ধ। তিতিরের মনে হলো এত সুস্বাদু খাবার ও আর খায়নি। খেতে খেতে মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছিল,'আমি আপনার কাছ থেকে সব রান্না শিখবো। তারপর আর আপনাকে রাঁধতে দেবনা। আমি আপনাকে রেঁধে খাওয়াবো।'
খুব ভোরে ওরা রওনা দিয়েছিল যাতে রাতে থানচিতে থাকতে না হয়। কারন, থানচি যায়গাটা কারোরই তেমন পছন্দ হয়নি। সন্ধ্যার মধ্যেই ওরা বান্দরবান পৌঁছলো। তারপর রাতের বাসে ঢাকা। ঢাকার বাসেও তিতির মুগ্ধ পাশাপাশি বসলো। তিতিরের মন খারাপ লাগছিল। পথ তো শেষ হয়ে যাচ্ছে, মুগ্ধ এখনো কিছু বলল ন। মুগ্ধ আর ও টুকটাক কত গল্প করছে। ম্যক্সিমাম ট্রাভেলিং রিলেটেড। ১০ দিনের ট্যুর ৫ দিনে শেষ হয়ে গেল পারমিশন না পাওয়ার কারনে। ৪০% টাকা ফেরত পেল। এই টাকা দিয়ে তো অন্য কোথাও ঘুরে আসা যায়! তিতিরের ইচ্ছে করছে মুগ্ধর সাথে অন্য কোথাও চলে যেতে কিন্তু ও কখনোই তা বলতে পারবে না। এত চিন্তার মধ্যেও ও বেশ কয়েকবার ঘুমালো। উঠলো, গল্প করলো। কিন্তু মুগ্ধ কিছুই বলল না।
আস্তে আস্তে একসময় সকাল হল। বাস চলে এল ঢাকায়। মুগ্ধ আর তিতিরের গন্তব্য একই যায়গা, ধানমন্ডি ১১ নম্বর রোড। দুজনে একটা সিএনজি নিল। তিতিরের বাসার সামনে এসে মুগ্ধ সিএনজি ছেড়ে দিল। একটা বাসা পরেই ওর বাসা। হেটেই চলে যেতে পারবে।
দুজনেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিতিরের বাসার সামনে রাস্তার অপজিটে। দুজনেরই মন খারাপ। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারলো না। ভেবে পেলনা কি বলবে। একসময় মুগ্ধ ম্লান হেসে বলল,
-"ওকে বাসায় যাও তাহলে।"
-"হ্যা যাচ্ছি।"
-"ভাল থেকো। নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। সাবধানে থেকো।"
-"আপনিও ভাল থাকবেন।"
তিতির আর দাঁড়ালো না, চলে গেল। গেটের সামনে গিয়ে তিতির একবার পিছন ফিরে তাকালো। মুগ্ধ পকেটে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে ফিরে তাকাতে দেখেই হাসলো। তিতিরও একবার হাসলো। তারপর গেটের ভেতর ঢুকে গেল।
তিতির ভেতরে যাওয়ার পর মুগ্ধ উলটো ঘুরে নিজের বাসার দিকে হাটতে লাগলো। বাসার গেটের ভেতর ঢুকতেই মনে পড়লো তিতিরের ফোন নাম্বারটাই তো আনা হয়নি! কোনরকমে গেটটা খুলে দৌড় দিল। এক দৌড়ে চলে এল তিতিরের বাসার সামনে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
অন্যদিকে এক সিঁড়ি উঠে দোতলার অর্ধেকে যেতেই তিতিরের খেয়াল হল মুগ্ধর ফোন নাম্বার নেয়া হয়নি। এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমতেই বাবার সাথে ধাক্কা লাগলো। বাবা ওকে দেখে খুশিতে বলে উঠলো,
-"ওরে বাবা! আমার আম্মা দেখি ১০ দিনের যায়গায় ৫ দিনে এসে গেছে। কিন্তু আম্মা দৌড়াচ্ছে কেন?"
-"বাবা সিএনজিতে আমার পার্স ফেলে এসেছি।"
এছাড়া আর বিশ্বাসযোগ্য কোন কথা খুঁজে পেলনা তিতির। বাবা বলল,
-"বাইরে তো কোন সিএনজি নেই।"
-"ওহ! বাবা আমি আরেকটু খুঁজে দেখি?"
-"নেই তো মা। বাদ দে। কি এমন ছিল পার্সে?"
-"টাকা।"
-"ওহ। তাতে কি হয়েছে? টাকা গেছে যাক। আমার মেয়ে তো সেফলি ফিরে এসেছে।"
-"বাবা ওতে পাঁচ হাজার টাকা ছিল। ট্যুরের টাকা বেচে যাওয়ার ফেরত পেয়েছি। আমি ভেবেছিলাম ওটা দিয়ে কিছু করবো। বাবা আমি যাই?"
-"আরে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা? চল আমি তোকে এক্ষুনি দিয়ে দিচ্ছি। এর জন্য নাকি আমার আম্মা এত সকালে বাইরে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে।"
তিতির মন খারাপ করে বাবার সাথে সিঁড়িতে উঠলো,
-"এত সকালে তুমি কোথায় গিয়েছিলে বাবা?"
-"নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এত সকালে আর কোথায় যাব? চল চল। উপড়ে চল। আজ আমি নিজে বাজারে গিয়ে বাজারের সবচেয়ে বড় ইলিশ মাছটা নিয়ে আসব আমার আম্মার জন্য।"
কিন্তু তিতিরের অস্থির লাগছিল। একেকটা সিঁড়ি যেন একেকটা উঁচু পাহাড়ের চেয়েও বেশি উঁচু মনে হচ্ছিল।
To be continued....

COMMENTS

Name

অচেনা প্রান্তর,1,অনুভুতির প্রতিশোধ,3,অপেক্ষা,1,অবিদিত সেই তুমি,1,অ্যাফ্লিক্টেড বোবা,1,আপেক্ষিক,1,আমার জন্ম ভূমি,1,আরেক জগৎ,1,আসবে মরণ,1,আহারে জীবন,1,ঈদের চাঁদ,1,উপন্যাস,31,একে আজাদ,4,ওরে খোকা,1,কবিতা,19,কলমের শক্তি,1,গল্প,34,চাঁদ মামা,1,চিত্তের আর্তনাদ,1,ছোট গল্প,9,জিসান আহম্মেদ রাজ,24,দৃষ্টির আগোচরে,3,ধৈর্যের ফল,1,ধোকা,12,পিচ্চি বউ,13,প্রত্যাবর্তন,2,প্রেমাতাল,31,ফরিদ সরকার,10,ফারজানা শারমিন,2,ভিন্ন চোখ,1,ভুল,1,মিছে স্বপ্নের জাল বুনি,1,মেঘ রোদ্দুর,2,মৌরি মরিয়ম,31,শফিক নোমানী,3,শশুরবাড়ি,6,সুখ দুঃখ,1,সুরভিত অতীত,1,সেই তুমি,1,সৌরভ সাধুখান,1,হৃদয় চৌধুরী,18,
ltr
item
LekhaPriyo.Com - Writers & Readers Network: প্রেমাতাল পর্ব - ১৮ || মৌরি মরিয়ম
প্রেমাতাল পর্ব - ১৮ || মৌরি মরিয়ম
https://3.bp.blogspot.com/-kXPikmMR8GQ/XLLhybdXSdI/AAAAAAAAARA/WoSCuMGlsl8DtgA0u6CAHfd2JcN1JMb-gCPcBGAYYCw/s320/Logopit_1555224034127.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-kXPikmMR8GQ/XLLhybdXSdI/AAAAAAAAARA/WoSCuMGlsl8DtgA0u6CAHfd2JcN1JMb-gCPcBGAYYCw/s72-c/Logopit_1555224034127.jpg
LekhaPriyo.Com - Writers & Readers Network
https://www.lekhapriyo.com/2019/05/blog-post_30.html
https://www.lekhapriyo.com/
https://www.lekhapriyo.com/
https://www.lekhapriyo.com/2019/05/blog-post_30.html
true
1831162134532447050
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content