শশুরবাড়ি পর্ব - ০১ || হৃদয় চৌধুরী

Hridoy Chawdhury ফুলশয্যা... জীবনের এক বহু প্রতীক্ষিত ভালোবাসার অনন্য মুহুর্ত.. ব্যাচেলর লাইফ থেকে মুক্ত হয়ে অবশেষে আমিও এই নিশিযা...


Hridoy Chawdhury
ফুলশয্যা... জীবনের এক বহু প্রতীক্ষিত ভালোবাসার অনন্য মুহুর্ত.. ব্যাচেলর লাইফ থেকে মুক্ত হয়ে অবশেষে আমিও এই নিশিযাপনের সুযোগ পেয়েছি..
বউ আমার খুব সুন্দর করেই বেনারসী পরে সেজেগুজে বাসর ঘরে ওয়েট করছে.. আমি এতোক্ষণ বন্ধুদের সাথে বাগানে আড্ডা দিচ্ছিলাম..
ওদের থেকে ছাড়া পেয়ে এখন নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালাম.. বুকটা ধুকপুক করছে.. গলা শুকিয়ে কাঠের মতো অবস্থায়.. কোনোমতে গিয়ে দরজাটা খুলে বাসর ঘরে ঢুকলাম..
বাহ্! ফুলে ফুলে বেশ ভালো করেই সাজানো হয়েছে রুমটা.. এতোসব ফুলের সমাহারে সবথেকে মনোরম ফুলটা যেন আমার বউ ই.. কতো লজ্জামুখে লম্বা ঘোমটা টেনে চুপটি করে বসে আছে.. ওকে দেখে আমার অন্তর দিয়ে কেমন যেন এক বাতাস বয়ে যাচ্ছে...
আমি রুমের দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ফুলেসজ্জিত বেডের দিকে এগিয়ে গেলাম.. ধীরে ধীরে বসলাম বউয়ের পাশে.. ওভাবে কতোক্ষণ নিরবে স্থির হয়ে থাকলাম.. কি থেকে কি বলে শুরু করবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না..
অবশেষে মনে হলো আগে ঘোমটাটা সরানো দরকার.. এতে করে চোখে চোখ পড়লে কথা বলার একটু তাগিদ পাওয়া যাবে.. অবশ্য বউয়ের চেহারাটা দেখার জন্যও মনটা আকুপাকু করছে আমার.. তো আর কিছু না ভেবে সরিয়েই ফেলি ঘোমটা..
চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ঘোমটা সরানোর হাত উঠালাম.. কোনোরকম কাঁপা কাঁপা হাতে ঘোমটাটা সরাতে উদ্যত হচ্ছিলাম.. ঘোমটা উঠিয়ে ফেলবো ঠিক এমন মুহুর্তেই চুলে কেউ সজোরে এক টান দিলো..
চুলে টান খেয়ে দ্রুত এক লাফে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম আমি.. উঠে বসে জোরে জোরে প্রশ্বাসের সাথে সাথে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলাম..
'বউ, বউ' বলে ঘুম কাটিয়ে আশেপাশে তাকাতেই দেখলাম তিতু ওর কোমরে হাত দিয়ে বিরক্তির চেহারায় তাকিয়ে আছে,
-বউ কোত্থেকে পেলি তুই!
তিতুকে দেখে ঘুমের চোখেই একদম চমকে উঠলাম আমি.. উফফ গড! স্বপ্ন ছিলো তাহলে! খুব বিরক্ত বোধ করলাম আমি.. ঘুমকন্ঠেই তিতুকে বকতে লাগলাম আমি,
-ধুউর! বউয়ের চেহারাটাও দেখতে পেলাম না! ফুলশয্যাটাও ভেস্তে দিলি ব্যাঙ...
-এহহ!! স্বপ্নের ছিরি দেখো! বিয়ে হচ্ছে দাদাভাইয়ের... আর ফুলশয্যা করছেন উনি!
-আরে এক কথাই তো! ঘুরে ফিরে তুই তো বউদি ই ডাকবি...
-মাথা! এই নিয়ে তোকে ছয়বার ডাকা হলো ঘুম থেকে উঠার জন্য.. কিন্তু তোর সেই কুম্ভকর্ণের ঘুম শেষই হয় না! বাইরে কতো কাজ.. বাবা জেঠাইরা খুজছে তোকে..
-কতো ঘুম পায় রে... (আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে)
-দেখি ওঠ্ ওঠ্! নাহলে তোকে রেখেই বরযাত্রী চলে যাবো..
-ইহ্! আমাকে ছাড়া কোনো শুভ কাজ হতে পারে নাকি..
-ঢং! ওঠ্ তাড়াতাড়ি...
-উম..
তিতু মুখ ভেংচিয়ে রুম থেকে চলে গেলো.. ধুউর! আমার কতো ভালো স্বপ্নটায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে দিলো.. আমার সাধের ফুলশয্যা..
আহ্ ব্যাচেলর লাইফেও কতো স্বপ্ন!
অবশ্য এতে আমার মতো নিষ্পাপ ছেলের কোনো দোষই নেই.. এমন স্বপ্ন আসতেই পারে... ৬/৭দিন ধরে যে বিয়ে বিয়ে চিন্তা মাথায় ঘুরছে.. যদিও আমার বিয়ে না..
সারা বাসায় এক হৈচৈ আর কোলাহল.. হওয়াটাই স্বাভাবিক.. দাদাভাইয়ের বিয়ে.. আজ দুপুরের দিকে বরযাত্রী যাবো সবাই...
কনের বাড়ি কিছুটা গ্রাম আর শহরের মধ্যবর্তী স্থানে.. তবে ওরা এমনিতে বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকেই বিলং করে.. আমাদের থেকে কোনো দাবি দাওয়া নেই.. ওরা নিজে থেকেই মেয়েকে যা পারে, দিয়ে দেবে..
আমাদের স্থায়ী ঠিকানা শহরে হলেও এবার দাদাভাইয়ের বিয়েটা উনি ঠিক করলেন গ্রামের বাড়ি থেকে করাবেন.. অবশেষে পরিবারের সবার সম্মতিতে গ্রামের বাড়ি থেকেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু করা হয়েছিলো..
গ্রামের বাড়িতে আসার পর থেকেই বিয়ে নিয়ে এতো ধকল চলছে... এতো কাজ.. বাবা-কাকা, ভাই-বন্ধুদের সাথে মিলে সব সামলানো.. বিয়েতে মজা ফুর্তি নাচানাচি.. সব কিছু মিলিয়ে খুবই ক্লান্ত লাগতেছে.. ঘুম ছাড়ছেই না..
অথচ বাইরে আবারো বরযাত্রী যাওয়া নিয়ে কতো কাজ টাজ.. এসব রেখেই আমি মরার মতো ঘুমাচ্ছি.. এখন উঠে যাওয়া দরকার বাবা! নাহলে জুতোপেটা খেতে হবে...
কোনোমতে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বিয়ের কাজে সাহায্য করতে গেলাম.. গিয়ে বরযাত্রী যাওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে.. সবাই সেজেগুজে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে রেডি..
আমাদের গ্রামের বাড়ির দু'মিনিট দূরত্বের গাঙে দুইটা ইঞ্জিনচালিত ঘরওয়ালা নৌকা অপেক্ষা করছে..
বরযাত্রীরা সবাই গিয়ে নৌকায় উঠছে.. কেউ ভেতরে.. কেউ ছাদের উপরে.. আমি গিয়ে নৌকার উপরেই এক মাঝি ভাইয়ের কাছে বসলাম..
সবাই খুব উৎফুল্ল মুডে.. পরিবারের বড় ছেলের বিয়ে বলে কথা! দাদাভাই কি সুন্দর বর টর সেজে নৌকার ভেতরে ফ্রেন্ডদের সাথে বসলো..
দুই স্টেপে যেতে হবে.. প্রথমে এই নৌকা গিয়ে এক অন্য গ্রামের গঞ্জে থামবে.. তারপর সেখান থেকে আবার এক নরমাল ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে যেতে হবে..
কনেপক্ষের গ্রামে পৌছতে পৌছতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো.. ওখানে নেমে মূল গন্তব্যের জন্য আবার ১৫/২০ মিনিটের মতো হাটতে হবে..
আমাদের নৌকাটা এবার আগেই পৌছেছিলো.. তবে দাদাভাই এবার অন্য নৌকাতে ছিলো.. আমরা সবাই তাই পাড়ে দাঁড়িয়ে বরের নৌকার ওয়েট করছিলাম..
দাদাভাইয়েরা নামতেই আমরা সবাই মিলে হাটা শুরু করলাম.. গ্রামের সন্ধ্যারাতের পরিবেশ.. রাস্তা কতো এলোপাথারি আর অন্ধকারাচ্ছন্ন..
বরযাত্রীরা সব হেই সেই কথা বলতে বলতে বিয়েবাড়িতে যাচ্ছিলাম.. কিন্তু তখন থেকে হাটতে হাটতে আমার পায়ে পুরো ব্যথা ধরে যাচ্ছে.. এমনিতেই শরীরটা কেমন মেজমেজ করছে!
হঠাৎই কানের মধ্যে জোরে জোরে সাউন্ড বক্সের গান আসতে লাগলো.. উফ! তাহলে কাছাকাছিই চলে এসেছি.. একটু যেন আরাম পেলাম প্রাণে..
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিয়েবাড়ির গেইট নজরে পড়লো.. কিছুটা গ্রামীণ এলাকায় হলেও ওদের দালান বাসা.. খুব সুন্দরভাবে বাসার চারপাশে সাজানো হয়েছে..
দাদাভাইকে নিয়ে কাকা আর ওর ফ্রেন্ডরা আগে আগে চলছে.. দাদাভাই ওর ডান হাত দিয়ে ওর ধূতির কুচিটা ধরে আছে.. আর অন্য হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে আমাদের চার বছরের ভাতিজা অন্তু ধরে আছে.. ক্যামেরাম্যান তো সেই তখন থেকেই এদিক সেদিক থেকে ভিডিও করতে করতে যাচ্ছিলো..
ওরা গিয়ে গেইটের সামনে দাড়ালো.. এটার ব্যবস্থা খুব সুন্দরভাবে করা হয়েছে.. ওখানে দাদাভাইকে একটা সজ্জিত চেয়ারে বসতে দিলো.. সামনের টি-টেবিলে কতোরকমের খাবার.. নানারকম মিষ্টি, সুন্দরভাবে সার্ভ করা ফল-মূল.. দুধ, জুস.. হেই সেই.. ইশ! দেখেই খিদে পেয়ে যাচ্ছে..
টেবিলের একদিকে বরযাত্রী.. অন্যদিকে কনেপক্ষ.. একদল মেয়েরা দাঁড়িয়ে.. হয়তো দাদাভাইয়ের শালিরা.. দুপক্ষের ক্যামেরাম্যান একত্রিত হয়ে ভিডিও করতে লাগলো.. বরযাত্রীর আপ্যায়ন শেষ.. এবার ভেতরে ঢোকার পালা..
কনেপক্ষ আর বরযাত্রী মিলে বিয়েবাড়িতে কতো ভিড়! বর সবার আগে আগে.. তারপরের সবাই ঠেলাঠেলি করে কোনোমতে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতে লাগলো.. এতো ভিড়ের মধ্যে ঢুকে আমি একটু সাইড দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেতে চাইছিলাম..
হঠাৎ কোনো এক কোমলমতির শরীরে ধাক্কা খেয়ে বেকুব হয়ে গেলাম.. চোখের সানগ্লাসটা খুলে পড়ে গেলো আমার.. কিছুটা বিরক্ত হয়ে ওটা নিচ থেকে তুলে সামনে তাকালাম..
তাকাতেই দেখলাম নীল শাড়ি পরিহিতা কোনো এক কন্যা মুখ ফিরিয়ে আমার বিপরীত দিকে তাড়াহুড়া করে দৌড়ে যাচ্ছিলো.. চেহারা দেখতে পারিনি, তবে পেছন থেকে যতোটুক দেখলাম, তাতেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি.. একে তো নীল শাড়ি.. তার উপর ঘন কালো চুলে এক আকর্ষণীয় খোপা করা.. তাতে ফুলের বেষ্টনি..
মেয়েটা যে দৌড়ে যাচ্ছিলো, তাতে ওর আচলটা খুব সুন্দর মাটিতে ডিস্ট্যান্স রেখে ঢেউ খেলাতে খেলাতে দুলছিলো.. আমি মুগ্ধ চাহনিতে নির্বাক দাড়িয়ে ওর যাওয়াটাই উপভোগ করছিলাম..
.
.
(চলবে)

COMMENTS

Name

অচেনা প্রান্তর,1,অনুভুতির প্রতিশোধ,3,অপেক্ষা,1,অবিদিত সেই তুমি,1,অ্যাফ্লিক্টেড বোবা,1,আপেক্ষিক,1,আমার জন্ম ভূমি,1,আরেক জগৎ,1,আসবে মরণ,1,আহারে জীবন,1,ঈদের চাঁদ,1,উপন্যাস,31,একে আজাদ,4,ওরে খোকা,1,কবিতা,19,কলমের শক্তি,1,গল্প,34,চাঁদ মামা,1,চিত্তের আর্তনাদ,1,ছোট গল্প,9,জিসান আহম্মেদ রাজ,24,দৃষ্টির আগোচরে,3,ধৈর্যের ফল,1,ধোকা,12,পিচ্চি বউ,13,প্রত্যাবর্তন,2,প্রেমাতাল,31,ফরিদ সরকার,10,ফারজানা শারমিন,2,ভিন্ন চোখ,1,ভুল,1,মিছে স্বপ্নের জাল বুনি,1,মেঘ রোদ্দুর,2,মৌরি মরিয়ম,31,শফিক নোমানী,3,শশুরবাড়ি,6,সুখ দুঃখ,1,সুরভিত অতীত,1,সেই তুমি,1,সৌরভ সাধুখান,1,হৃদয় চৌধুরী,18,
ltr
item
LekhaPriyo.Com - Writers & Readers Network: শশুরবাড়ি পর্ব - ০১ || হৃদয় চৌধুরী
শশুরবাড়ি পর্ব - ০১ || হৃদয় চৌধুরী
https://2.bp.blogspot.com/-YphWQm-YHHQ/XI5euFXzFII/AAAAAAAAAKg/JeiuF_cCCuYmWnKhgRZ7SwOaQ0wCmTTMwCLcBGAs/s1600/Logopit_1552824888619.jpg
https://2.bp.blogspot.com/-YphWQm-YHHQ/XI5euFXzFII/AAAAAAAAAKg/JeiuF_cCCuYmWnKhgRZ7SwOaQ0wCmTTMwCLcBGAs/s72-c/Logopit_1552824888619.jpg
LekhaPriyo.Com - Writers & Readers Network
https://www.lekhapriyo.com/2019/03/blog-post_72.html
https://www.lekhapriyo.com/
https://www.lekhapriyo.com/
https://www.lekhapriyo.com/2019/03/blog-post_72.html
true
1831162134532447050
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content